আল্লাহ সব কিছুই জানেন

পরিভাষায় সুন্নাতের অর্থ হচ্ছে, রাসূল সা:-এর জীবনাদর্শ, যা তাঁর কথা, কাজ ও অনুমোদনের সমষ্টি। কুরআন ও হাদিসে সুন্নাত পালনের জন্য জোর তাকিদ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সুন্নাত পালনে উপো করলে বা অবহেলা প্রদর্শন করলে এর ভয়াবহ পরিণামের কথাও আল্লাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। কারণ রাসূল সা:কে অনুসরণ করা, অনুকরণ করা ঈমানের দাবি।

কুরআনে বর্ণিত হুঁশিয়ারিমূলক কয়েকটি বর্ণনা :

(১) ‘আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হবে এবং নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে, তিনি তাকে দোজখে দাখিল করবেন, সেখানে সে চিরকাল থাকবে’ (সূরা নিসা : ১৪)।

(২) ‘কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য এ অবকাশ নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোনো কাজের নির্দেশ দেন, তখন সে কাজে তাদের কোনো নিজস্ব সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তো প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়’ (সূরা আহযাব : ৩৬)।

(৩) ‘অতএব যারা তাঁর (রাসূলের) আদেশের বিরোধিতা করছে, তাদের ভয় করা উচিত যে, তাদের ওপর বিপর্যয় আপতিত হবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক আজাব তাদের গ্রাস করবে’ (সূরা নূর : ৬৩)। 

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ বলে ঈমানদার ঈমান আনয়নের যে স্বীকৃতি দেয়, এ স্বীকৃতি অনুযায়ী সুন্নাতকে গুরুত্ব না দেয়ার কোনো সুযোগ- অবকাশ কি মুসলমান নারী-পুরুষের জন্য রয়েছে? সূরা হাশরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ঘোষণা সুন্নাত অনুসরণের গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্ণিত হয়েছে, ‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন (যা করতে আদেশ করেন) তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো। আর ভয় কর আল্লাহকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা’ (সূরা হাশর : ৭)। রাসূল সা:কে অনুসরণ-অনুকরণ না করে ঈমানদার দাবি করার, ঈমানের দাবিদার হওয়ার কোনো সুযোগ ইসলাম ধর্মে নেই। তাই তো কসম করে স্বয়ং আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে, ‘তোমার পালনকর্তার কসম! সে লোক ঈমানদার নয় (পাক্কা ঈমানের, আশেকে রাসূল আর সুন্নির দাবিদার হলেও) যতণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদ-সমস্যার ব্যাপারে তোমাকে (তোমার সুন্নাত-আদর্শকে) ন্যায়বিচারক মনে না করে’ (সূরা নিসা : ৬৫)।

স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, রাসূল সা:-এর বিরোধিতা (সূরা নূর : ৬৩) মানে রাসূলকে অস্বীকার করা নয়, আয়াতে বর্ণিত বিরোধিতা মানে রাসূল সা:-এর আদর্শ অনুসরণ না করা, সুন্নাত পালনে উপো করা, সুন্নাতের ওপর আমলে শৈথিল্য প্রদর্শন করা, সুন্নাতকে গুরুত্ব না দেয়া। আল্লাহর হুকুমের পাশাপাশি রাসূল সা:-এর তরিকার অনুসরণ না করলে যে প্রকারান্তরে রাসূল সা:কে অস্বীকার করা হয়, করা হয় অমান্য, করা হয় রাসূল সা:-এর বিরোধিতা এই বিষয়টি উম্মত-দরদি রাসূল সা: উম্মতদের বুঝার, জানার আর উপলব্ধির জন্য আরো স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাঁর মুখ নিঃসৃত বাণীতে। বুখারি শরিফে বর্ণিত হাদিস হচ্ছে, ‘আমার উম্মতের সব লোকই জান্নাতি হবে, অস্বীকারকারী ছাড়া। জিজ্ঞেস করা হলো, হে রাসূল সা:! কে অস্বীকারকারী? উত্তরে তিনি বললেন, ‘যে আমার অনুসরণ করল, সে-ই বেহেশতে প্রবেশ করবে আর যে ব্যক্তি অনুসরণ করল না, সে-ই অস্বীকারকারী’।

এককথায় মুহাম্মাদ সা: হচ্ছেন মানুষের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণকারী মানদণ্ড। বলার অপো রাখে না যে, রাসূল সা:-এর বাধ্যতা স্বীকার করার অর্থ তাঁর আদর্শ গ্রহণ, পালন ও রা করা, বিলয় হতে না দেয়া আর এ জন্য প্রয়োজনে অর্থসম্পদ ব্যয়সহ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা, ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকা। 

বিশ্বমানবতার জন্য বিশেষ করে মুসলমানদের জন্য রাসূল সা: এক সর্বোত্তম আদর্শ ও রহমতস্বরূপ। তাঁর ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় জীবন যেমন আমাদের জন্য আদর্শ, তেমনি তাঁর পারিবারিক, সামাজিক, ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক, সৈনিক তথা সংগ্রামী জীবনও আমাদের জন্য আদর্শ। বর্তমানে আমরা তাঁর সমগ্র আদর্শকে গ্রহণ না করে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা, প্রয়োজন আর মর্জিমাফিক তাঁর আংশিক আদর্শকে মেনে চলছি। সহজ-সরল সুন্নাতের আংশিক অনুসরণ করে, কঠিন সুন্নাতগুলো বাদ দিয়ে রাসূল সা:-এর খাঁটি উম্মতের দাবিদার সেজে তাঁর শাফায়াতের আশায় বসে আছি আর কল্পনার রথে জান্নাতে পাড়ি জমাচ্ছি। অথচ আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে, ‘তাদের মধ্যে এমন অনেক আছে যারা মূর্খ ও নিরর। তারা মিথ্যা আকাক্সা ছাড়া আল্লাহর কিতাবের (কুরআন ও হাদিস) কিছুই জানে না, তারা বাজে কল্পনার মধ্যে ডুবে আছে’ (সূরা বাকারা : ৭৮)।

ধর্মের কিছু আদেশ-নিষেধ মেনে ও কিছু বর্জন-অমান্য করে আর রাসূল সা:কে কিছু অনুসরণ করে এবং রাসূল সা:-এর কিছু সুন্নাতকে অমান্য করে অথবা কিছু সুন্নাতের ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করে কি আল্লাহর সন্তুষ্টি, দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তি পাওয়া যাবে?

না, কখনো না। কারণ আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে, ‘তবে কি তোমরা কিতাবের (রাসূল সা:-এর হাদিস ও সুন্নাত) কিয়দংশ বিশ্বাস কর-মান্য কর আর কিছু অংশ অবিশ্বাস-অমান্য কর? যারা এরূপ করবে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই আর কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ কর্ম সম্পর্কে বেখবর নন’ (সূরা বাকারা : ৮৫)।